পত্র গল্প
চিঠি দিবস স্মরনে - অনন্য রাসেল।
পত্রগল্প: হাবিবে কাওসার
বন্ধু কাওসার হাবীব
কেমন আছিস বন্ধু? নিশ্চয়্ ভালো আছিস। তুই ভালো না থাকলে আর কে ভালো থাকতে পারে বল! তোর মতো ন্যায় নীতিবান আদর্শ সন্তান কে হতে পারে বল! আল্লাহর দুনিয়ায় তুই পরিপূর্ণ মানুষ ছিলি। ছিলি পাক্কা ইমানদার,বিনয়ী এবং কঠোর নামাযী।কুরআনের বানী তোর মুখস্ত ছিলো। তুই ছিলি কামিল ফাযিল পাশ করা মেধাবী ছাত্র। শাহজাহানপুরের আতাইল মাদ্রাসার সেরা ছাত্র ছিলি। প্রত্যন্ত একটা মাদ্রাসায় পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানে ভর্তি হওয়া কম কথা না। ও সময় আমি ধর্মের বিষয়ে উদাসীন ছিলাম আর তুই ছিলি পাক্কা হুজুর।
তবুও তোর আর আমার বন্ধুত্বে ঘাটতি ছিলো না।
তুই আমারে ডাকতিস - শ্যালা ভন্ড বলে।যদিও এটা বন্ধু মহলেই সীমাবদ্ধ থাকত।
তোর দরাজ কন্ঠের তেলোয়াত আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনেছি। আহ! আজো কানে বাজে বন্ধু! তোমার সেই দরদী আওয়াজ।
শেখ সাদীর বেলা গেলো উলা বে কামা লিহি--- তোর কন্ঠে পূর্নতা পেয়েছিলো।
আজ আমার মনে হচ্ছে তুই ছিলি শহীদুল্লাহ্ নব সংস্করণ। যে আরবি ফার্সির পাশাপাশি রবীন্দ্র সংগীত গাইতে পারত। তোর থেকে মাঝে মাঝেই টাকা ধার নিতাম।সে উছিলায় বসে থাকতাম আর সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে সবাই বাহিরে গেলে তোর টেপ রেকডারে রবীন্দ্র সংগীত শুনতাম।
তুই প্রথম চিনিয়েছিলি কাদেরি কিবরিয়াকে,রেজুয়ানা চৌধুরী বন্যাকে।ইদ্রানী সেনের আমার পরাণ যাহা চায় তুমি তাই তাই গো-তুই প্রথম শুনিয়েছিলি।
কাওসার
তুই তো জানিস।আমি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির আগ পর্যন্ত হিন্দি গান শুনিনি,রবীন্দ্র সংগীত শুনিনি।
কলেজ লাইফে পারভেজ ওয়াকম্যানে তাহসান এর গান শুনেছি,গিটার বাজান দেখেছি। কিন্তু রবীন্দ্র সংগীত তোর ওখানে গিয়ে পেয়েছি। এক হিসেবে তুই আমার ভাবনায় নাড়া দিয়ে সাড়া ফেলেছিলি।
তোর সাথে আমার পরিচয় বগুড়া জেলা হিসেবে।হাবিব ভাইয়ের মাধ্যমে।তোর মাধ্যমে পরিচয় সুমনা আর কামরুন্নাহার এর সাথে।সুমনা হয়ে ওঠে বড় ভগ্নির ন্যায় বান্ধবী। ওর যা বুদ্ধি ছিলো। ওদের বাড়ি আমি বেড়াতে গিয়ে ছিলাম। যমুনা নদীর তীরে বসে ইতি আমার পরাণ ও যাহা চায় -শুনিয়েছিলো। ইতি মাঝে মাঝে আমাকে প্রেমের চিঠি লিখতো। উত্তর দেইনি। চিঠি লিখতে পারতাম না কিন্তু আমি নাহারে আচ্ছন্ন ছিলাম।তারপর যা হয় সব ইতিহাস তোর জানা।
বন্ধু
আমি কোন দিন চিঠি লিখিনি। চিঠি লেখার মানুষ পাইনি।আমি যা লিখেছি তা চিঠির ফর্মে আবেদন পত্র। বাপের কাছে। প্রতি মাসে না হোক, বছরে ৫/৬ টা হবে।টাকা চাওয়া ছাড়া অন্য কোন বালাই তাতে ছিলো না।
আজ চিঠি দিবসে মনে ভেসে আসছে সে দিনের কথা--
আমার বন্ধু কাওসার ভালো চিঠি লিখিত।কাব্যিক ভাষায় যেন হৃদয়ের মহাকাব্য রচনা করত সে।মনের অটপসি করলেই আমাকে পাবে।এটা যে ময়নাতদন্তের সুরিতহাল তা আমি জানতাম না। কাওসার তার বান্ধবীদের চিঠি লিখতো।হৃদয়ের সুরতহাল হতো। সেগুলো ছিলো ছোট কিন্তু সরেশ ঠিক রসগোল্লার মতো হৃদয় ভরে উঠতো।
সেটা প্রেম না হয়ত কিন্তু ভাব ভাষা প্রেমের। আমি মুহসিন হলের দোতলায় ওর রুমে যেতাম।ছয়তলা থাকার সময় ওর ওখানে জিরিয়ে নিয়ে তারপর উঠতাম। ও আমার নন পলিটিক্যাল বন্ধু ছিলো।কাওসার রাজনীতি করত না কিন্তু রাজনীতি বুঝতো।বেঁচে থাকলে হয়ত লেখক হতো কিংবা উচ্চ ব্যাংকার।বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকুরী পেয়েছিলো সে।কিন্তু বিধি চিন্তা ভিন্ন ছিলো।ওর মতো সুন্দর হাতের লেখা আমি দেখিনি।আমার দেখা একজন খাঁটি মেধাবী যে বিদ্যাভূষণ। যেতাম এজন্য যে কিছু না কিছু থাকতো ওর রুমে।আন্টির গরুর মাংস আর মুরগীর মাংসের রান্না আমিই বেশি খেয়েছি।
তোর চিঠি আমি বহুবার পড়েছি। কামরুন্নাহার আর সুমনাকে লেখা চিঠিগুলো আমি পড়েছি।
পড়েছি আর ভেবেছি যার হৃদয়ে প্রেম আছে সে এ চিঠির ভাষায় মুগ্ধ না হয়ে পারবে না।
নাহার তোর চিঠি খুব যত্ন করে রেখেছিলো।
বন্ধু
তোর চিঠি পড়েই আগ্রহ জাগে সুমনা আর নাহারের প্রতি। তুই সুমনাকে ভালোবাসতি।কিন্তু কাব্যিক রহস্যে ঘেরা থাকত সেটা। সুমনা সেটা বুঝত কিন্তু ও ছিলো হাবিব ভাইয়ে মশগুল। ফলে ওর ফুলদানিতে জায়গা হয়নি তোর ফুলের।
কিন্তু বাগান করে রেখেছিলো সুমনা তোকে।
নাহার তোকে পছন্দ করত। ভালোবাসতো। তোদের দুজনের স্বভাব একছিলো। কেবল নারী আর পুরুষের পার্থক্য।
তুই সুমনাকে ভালোবাসতিস বলে নাহার তা প্রকাশ করেনি বন্ধুই থেকে গেছে।অনেক সময় মানুষ চাতক পাখি হয়ে যায় কিন্তু চায় না। নাহারের লেকচার নোট বিনিময়ে সেটা
বুঝেছি।
বন্ধু
আজ বিশ বছর পরে তোকে লিখছি। জানি এ লেখা তোর পড়ার অতীত। তুই আমার ভাবনা জগতের সীমা পেরিয়ে গেছিস। এও জানি তুই চেতনা জগতে জ্বল জ্বল করছিস।
আজ চিঠি দিবসে তোকে জানিয়ে রাখি কামরুন্নাহার এর মনোজগতে তুই ছিলি আর আমি জোর করে সেটাই প্রবেশ করি। তোদের দুজনের মাঝে ভিন্ন গ্রহ হয়ে ওলট পালট করে দিই রাশি চক্র। নাহারের কষ্টির সাথে মিলিয়ে নেই আমার কষ্টি।
কিন্তু বন্ধু
প্রেমহীন ভালোবাসায় বিচ্ছিদ অনিবার্য। তোমার ভালোবাসা তুমি ফিরে পাও। দুজনে এক পার কর ভবসাগর।
সে আশায়
৷৷৷৷৷ তোর বন্ধু
মুহিত কামাল।
Comments
Post a Comment